logo
Blog single photo

সংসদীয় কমিটিকে টিকা উৎপাদনের পরিকল্পনা জানাল মন্ত্রণালয়

সংসদীয় কমিটির বৈঠকে দেশেই টিকা উৎপাদনের পরিকল্পনার কথা জানাল স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগসের বিদ্যমান অবকাঠামো এবং নতুন কিছু যন্ত্রপাতি কিনলেই টিকা উৎপাদন সম্ভব বলে তারা মনে করছেন। বিষয়টির কারিগরি দিক পর্যালোচনার ব্যাপারে মন্ত্রণালয় বিবেচনা করছে।

রোববার সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের দেওয়া কার্যপত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে। এ দিকে বৈঠকে পিপিই, মাস্ক ও কিট ক্রয়সহ নানা বিষয়ে এজেন্ডায় থাকলেও তা আলোচনা হয়নি। স্বাস্থ্যের ডিজি বৈঠকে অনুপস্থিত থাকায় আলোচনা সম্ভব হয়নি এবং কমিটির সদস্যরা এ কারণে চরম ক্ষুব্ধ হয়েছেন বলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক সদস্য জানিয়েছেন। 

কমিটির সভাতি শেখ ফজলুল করিম সেলিমের সভাপতিত্বে বৈঠকে আরো উপস্থিত ছিলেন-কমিটির সদস্য স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, আব্দুল আজিজ, সৈয়দা জাকিয়া নুর, রাহগির আলমাহি এরশাদ (সাদ এরশাদ) এবং আমিরুল আলম মিলন। 

বৈঠকের কার্যপত্রে বলা হয়, গত এপ্রিল মাসে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব শেফিল্ডের গবেষক সানজান কে দাস স্বাস্থ্য সচিবের কাছে সরকারি পর্যায়ে টিকা উৎপাদনের লক্ষ্যে অবকাঠামো তৈরি করতে একটি প্রস্তাব পাঠান। সানজান দাসের টিকা তৈরির প্রযুক্তির আরএনডি ও প্রি-ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল হয়েছে বলে কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়। 


এতে আরো বলা হয়, সরকারি প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগসের বিদ্যামান অবকাঠামো এবং নতুন কিছু যন্ত্রপাতি কিনলে টিকা উৎপাদন সম্ভব। বিষয়টির কারিগরি দিক পর্যালোচনার ব্যাপারে মন্ত্রণালয় বিবেচনা করছে।

বৈঠকের পরে সংসদ সচিবালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের সকল জনগণকে টিকার আওতায় নিয়ে আসার লক্ষ্যে টিকা উৎপাদন প্রক্রিয়ায় দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।

কমিটির আগের বৈঠকে করোনাভাইরাসের টিকা তৈরির জন্য দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে ‘উৎসাহ’ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ওই সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় জানায়, তিনটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের টিকা তৈরির সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে। 

এগুলো হলো- ইনসেপ্টা ভ্যাকসিন লিমিটেড, পপুলার ফার্মাসিউটিক্যালস, হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। এর মধ্যে ইনসেপ্টার কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন রেডি টু ফিল ও মাস্টার সিড উভয় প্রক্রিয়ার সক্ষমতা রয়েছে। পপুলারের মাস্টার সিড হতে উৎপাদনের সক্ষমতা নেই। হেলথকেয়ার অনুমোদন পেয়েছে তবে এখনও উৎপাদনে যায়নি। 

বৈঠকের কার্যপত্র বলা হয়, কোভিড-১৯ সংক্রমণের পর থেকে ৭ জুন পর্যন্ত সেন্ট্রাল মেডিকেল স্টোরস ডিপোর (সিএসডি) মাধ্যমে ২৬৬ কোটি ১৭ লাখ ২৪ হাজার টাকার মাস্ক এবং ৪০১ কোটি ২৫ লাখ টাকার আরটি-পিসিআর টেস্ট কিট কেনা হয়েছে। 

এছাড়া কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স এন্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস প্রকল্পের আওতায় ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৩৯ কোটি ৯ লাখ ২২ হাজার টাকার মাস্ক, ৩৫ কোটি ৮০ লাখ ৩১ হাজার টাকার আরটিপিসিআর কিট এবং কোভিড রেসপন্সে ইমাজেন্সি এসিসস্টেন্ট প্রকল্পের আওতায় ইউনিসেফের মাধ্যমে ৩২ কোটি ৯০ লাখ ৭২ হাজার টাকার কিট কেনা হয়েছে।

এতে বলা হয়- ভারতের সেরাম ইন্সস্টিটিউট থেকে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন কেনার চুক্তি হয়। এর মধ্যে ৭০ লাখ ডোজ পাওয়া গেছে। গত ৭ জুন পর্যন্ত ৫৮ লাখ ২০ হাজার ১৫ জনকে অ্যাস্ট্রাজেনেকার প্রথম ডোজ এবং ৪২ লাখ ২৩ হাজার ১৭৮ জনকে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন করার জন্য ১৪ লাখ ৪০ হাজার ৩০ টি টিকা ঘাটতি রয়েছে।

কার্যপত্রে বলা হয়, কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য সারাদেশে এক হাজার ১২৫াট আইসিইউ শয্যা রয়েছে। এছাড়া বেসরকারি হাসপাতালে ৪৬৬ শয্যা রয়েছে। ঢাকা মহানগর ছাড়া দেশের ২১টি জেলায় আইসিইউ শয্যা আছে। কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য ১১ হাজার ৯১৬টি সাধারণ বেড রয়েছে। ঢাকা মহানগরে এক হাজার ৫০১টি বেড বাড়ানো হয়েছে। দেশে বর্তমানে কোন অক্সিজেন সংকট নেই। মজুদ অক্সিজেন ৯০০ মেট্রিক টন। প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে প্রায় ১৭৫ মেট্রিক টন। সরকারি অর্থায়নে ৪০টি ও দাতা সংস্থার ফান্ডে ২৯টি অক্সিজেন প্ল্যান্ট কার্যক্রম চলছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডারের সংখ্যা ২৩ হাজার ৮৯টি। হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার সংখ্যা এক হাজার ৬০৩টি। অক্সিজেন কনসেনট্রেটরের সংখ্যা এক হাজার ৫২২টি। 

এদিকে বৈঠকে তথ্য বিভ্রান্তি এড়াতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য প্রদান ও পর্যালোচনা শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রদানের লক্ষ্যে অন্যান্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সহযোগিতা করার অনুরোধ করা হয়। বৈঠকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হয়।

স্বাস্থ্যের ডিজির অনুপস্থিতিতে ক্ষোভ 

বৈঠকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মাহাপরিচালক (ডিজি) আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম উপস্থিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করা করেছে। বৈঠকে কোভিড-১৯ মহামারি শুরুর পর এ পর্যন্ত কত টাকার মাস্ক ও কিট ক্রয় করা হয়েছে, ভ্যাকসিন সংকট মোকাবেলায় কি কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, ভ্যাকসিন জিটুজি নাকি এজেন্টের মাধ্যমে আনা হচ্ছে, কোভিড-১৯ মোকাবেলায় আইসিউ ও অক্সিজেনের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাব্য সংকট থেকে উত্তরণ নিয়ে আলোচনা করা হয়। বিস্তারিত এই আলোচনায় ডিজি না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে কমিটি।

সংসদীয় কমিটির একাধিক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বৈঠকে অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা ছিল। কিন্তু ডিজি বৈঠকে আসেননি। গুরুত্বপূর্ণ এই বৈঠকে ডিজি না আাসায় সদস্যরা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। কমিটির সভাপতি এ নিয়ে ডিজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণায়লকে নির্দেশনা দিয়েছেন। যদি ব্যবস্থা নেওয়া না হয় তবে বিষয়টি সভাপতি অধিবেশনে তুলবেন বলেও সতর্ক করেছেন। 

কমিটির সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, স্বাস্থ্যের ডিজি বৈঠকে না আসায় তারা নাখোশ হয়েছেন। বিষয়টি কমিটির সভাপতি বিস্তারিত বলতে পারবেন। 

জানা গেছে, বৈঠকে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ‘প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত প্রণোদনা’ এখনও না পৌঁছানোয় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। কমিটি সহজতর প্রক্রিয়ায় যাচাই বাছাইয়ের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে তাদের পরিবারের নিকট প্রণোদনার অর্থ পৌঁছানোর সুপারিশ করেছে। 

কমিটির সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, অনেকে অভিযোগ করেছে যে তারা প্রণোদনা পাননি। অনেক ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এই মানুষগুলো মারা গেছে। তাদের পরিবার নিঃস্ব। তারা যদি প্রণোদনা ঠিকমতো না পায় পরিবার কষ্টে থাকছে। দ্রুত এই প্রণোদনা যাতে সংশ্লিষ্টদের পরিবারের কাছে পৌঁছায়। 

বৈঠকে অংশ নেওয়া সংসদ সচিবালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, কমিটির কাছে অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিষয়টি আলোচনা হয়। মন্ত্রণালয় নানারকম আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা তুলেছে। কমিটি বলেছে, এসব জটিলতা দূর করাই মন্ত্রণালয়ের কাজ। কেউ মারা গেলে তার পরিবার কী তথ্য নিয়ে দ্বারে দ্বারে ঘুরবে?
Top